বাঙ্গলায় বিপ্লববাদ গ্রন্থে ঘটনাপ্রবাহ চমৎকার রূপে বর্ণিত হয়েছে। গ্রামগঞ্জের মানুষ প্রাকৃতিক দুর্যোগ শাসকদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে বিপ্লবীদের কথা শুনেছে।
এই গ্রন্থে অনেক বিপ্লবীর বহুরৈখিক কাজের তালিকা আছে। শতবর্ষ পরের নতুন সংস্করণে প্রয়োজনীয় টীকা ভাষ্য যুক্ত করে গ্রন্থের পাঠকপ্রিয়তার প্রচেষ্টা রয়েছে। দীর্ঘ ভূমিকার মাধ্যমে বিপ্লববাদের একটা গাথা রচনার চেষ্টা রয়েছে।
বিপ্লবীরা যে কেবল ইংরেজ শাসনকে চ্যালেঞ্জ করে সশস্ত্র কাজ করত তা নয়, গুপ্ত সমিতির মাধ্যমে প্রান্তিকের মানুষের সামনে বিপ্লবীকাজের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করে জাগরণ ও নিজস্ব জবাবদিহিতা ছিল। ইংরেজ শাসনের ভেদনীতির অনুপুঙ্খ ব্যাখ্যা ছাড়াও জনগণকে ইংরেজদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করতে সাংগঠনিক তৎপরতা ছিল।
গ্রন্থে বিভিন্ন অধ্যায়ের ভাগ বিভাজনের মাধ্যমে তৎসময়ে বিপ্লবী কাজের অবিভক্ত বাংলার চিত্রপট উঠে এসেছে। অধ্যায় শিরোনামে আছে—দেশাত্মবোধ, স্বদেশী আন্দোলন, নানাভাবের লোকসমাগম, বিপ্লবের অঙ্গ, গুপ্তধারা, সমিতির দুর্দিন, মামলা, জেলের অধ্যায়, মামলার ফল, মতভেদ, সমাজ ও সাহিত্যে বিশেষত্ব, ঘরছাড়া গোপন ও অখ্যাত জীবন, খুন, আগুনের খেলা, বৈদেশিক অংশ, বিপ্লবের শেষ শিখা ইত্যাদি। গ্রন্থের শেষাংশে পরিশিষ্ট ও বাংলার বিপ্লবীদের বয়স, জাতি ও পেশার বিভাজনে একটি তালিকা সিডিসন কমিটি হতে সংগ্রহ করে এখানে যুক্ত হয়েছে। শতবর্ষ সংস্করণে বইটিতে সংযোগ করা হয়েছে আরও কয়েকটি প্রণিধানযোগ্য পরিশিষ্ট।
সার্বিকভাবে বিপ্লববাদে বাংলা অঞ্চলের একটি সামাজিক চিত্র তুলে ধরার বিষয় আছে বইটির বিন্যাসে। পরিশেষে শতবর্ষ পূর্বে বিপ্লববাদের মাধ্যমে সমাজ মেরামতের যে তাগিদ ছিল বর্তমান কালপর্বেও সমাজের নানান অসংগতি দূরে বিপ্লববাদের শিক্ষা ও দ্যুতি সমাজের জন্য ভিন্ন আঙ্গিকে সুপ্রভাব ফেলবে এ আশা করতেই পারি।
| Book Name : | বাঙ্গলায় বিপ্লববাদ |
| Authors : | নলিনীকিশোর গুহ |
| Publisher: | Inhouse book |
| Edition: | 1st Edition February 2025 |
| ISBN Number: | 978-984-29364-0-1 |
| Total Page | 128 |
নলিনীকিশোর গুহ (১৮৯২ — ২৯ সেপ্টেম্বর ১৯৮৯) ছিলেন খ্যাতনামা সাংবাদিক ও স্বাধীনতা সংগ্রামী। তিনি দীর্ঘদিন আনন্দবাজার পত্রিকার সহকারী সম্পাদক থেকে ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দের কয়েকমাস সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। নলিনীকিশোর গুহের জন্ম ব্রিটিশ ভারতের অধুনা বাংলাদেশের তৎকালীন ঢাকা জেলার বজ্রযেগিনী গ্রামে। পিতা রাজকিশোর গুহ। গ্রামের স্কুলে পড়ার সময়ই তিনি পুলিনবিহারী দাসের সংস্পর্শে এসে স্বদেশ চেতনায় উদ্বুদ্ধ হন এবং ঢাকা অনুশীলন সমিতির সঙ্গে যুক্ত হন। ইতোমধ্যে তিনি তার মায়ের কাছ থেকেও দেশসেবার প্রেরণা পান। ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে জাতীয় বিদ্যালয় হতে ম্যাট্রিক পাশের পর অনুশীলন সমিতির নির্দেশে তিনি চিকিৎসাবিদ্যা অধ্যয়ন করেন এবং এল এম এস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। অনুশীলন সমিতিতে তার প্রধান কাজ ছিল ছাত্র ও যুবকদের দেশাত্মবোধে জাগিয়ে তোলা। তিনি সেই কাজ সুষ্ঠুভাবে করতে শঙ্খ এবং স্বাধীন ভারত পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হন। এদিকে ১৯১০ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে ঢাকা ষড়যন্ত্র মামলায় তাকে পনেরো মাস বিচারাধীন বন্দি করে রাখা হয়। আবার ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দের অন্য আর একটি মামলায় তাকে এক বছর সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হয়। মুক্তিলাভের পরও নিবর্তনমূলক আইনের তিন ধারায় তাকে আটক রাখা হয় এবং শেষে ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে মুক্তি লাভ করেন। বন্দিদশা হতে মুক্তি লাভের পর নলিনীকিশোর অনুশীলন সমিতির সাংগঠনিক কাজকর্ম ছেড়ে দিয়েও স্বদেশ চেতনা নিয়েই লেখালেখির জগতে প্রবেশ করেন। 'সোনার বাংলা' ও 'বাংলার বাণী'র সম্পাদক হিসাবে পরিচিতি লাভ করেন। তিনি ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়ের সশস্ত্র বিপ্লবীদের বৈপ্লবিক কার্যকলাপ ও বিদ্রোহের যাবতীয় বিষয় অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে উপস্থাপন করেন বাংলার বিপ্পববাদ গ্রন্থে। ভারতে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের এই বইটি সে সময়ে অত্যন্ত সাড়া জাগিয়ছিল, ফলে ব্রিটিশ শাসক বাজেয়াপ্ত করে।[২] গ্রন্থটির প্রথম সংস্করণ ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে (১৩৩০ বঙ্গাব্দে) প্রকাশিত হয়। নলিনীকিশোর দীর্ঘকাল আনন্দবাজার পত্রিকার সহকারী সম্পাদক পদে ছিলেন।[৩] ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দের কিছু সময়ে (২৫ জুন ১৯৫৪ - ৩ অক্টোবর ১৯৫৪) সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও, 'দৈনিক স্বরাজ', 'দৈনিক হিন্দুস্থান', ও 'জনসেবক' পত্রিকার সঙ্গেও যোগ ছিল। নলিনীকিশোর গুহ ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দের ২৯ সেপ্টেম্বর কলকাতায় প্রয়াত হন।